
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে গতিশীল করার প্রেক্ষাপটে এ চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। চুক্তির আওতায় রেললাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং স্টেশনগুলোতে প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপনের কাজ করবে এলঅ্যান্ডটি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) অধীনে বাস্তবায়নাধীন লাইন-১ প্রকল্পের এই দুটি প্যাকেজ হলো সিপি০৯ ও সিপি১০। এর মধ্যে সিপি০৯ প্যাকেজে রেললাইন ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে সিপি১০ প্যাকেজের আওতায় স্থাপন করা হবে সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর। মেট্রোরেলের নিরাপদ পরিচালনা ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করতে এসব ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেললাইন ও বিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ
এলঅ্যান্ডটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিপি০৯ প্যাকেজ বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটি তাদের জাপানি অংশীদার সুমিতোমো করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করবে। পুরো রুটে রেললাইন স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, ট্র্যাকশন সাবস্টেশন, ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করা হবে।
এ প্যাকেজের আওতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং চালুর কাজও থাকবে। অর্থাৎ, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মেট্রোরেল চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সমন্বিত প্রস্তুতিও এর অংশ।
অন্যদিকে সিপি১০ প্যাকেজের কাজের মধ্যে রয়েছে পুরো নেটওয়ার্কে সংকেতব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো স্থাপন এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর বসানো। ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
এলঅ্যান্ডটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুটি প্যাকেজের কাজ মিলিয়ে ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর মূল পরিচালনব্যবস্থা গড়ে উঠবে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থা চালু হলে ঢাকাবাসীর জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের নগর পরিবহনসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে মেট্রোরেল লাইন-১
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১ কিলোমিটার। প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্পে দুটি রুট রাখা হয়েছে। প্রথমটি বিমানবন্দর রুট, যা কমলাপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। দ্বিতীয়টি পূর্বাচল রুট, যা নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত যাবে। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুটি রুটে মোট ১৯টি স্টেশন থাকবে। এ ছাড়া পিতলগঞ্জে নির্মাণ করা হবে একটি ডিপো, যেখানে ট্রেন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা থাকবে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিমানবন্দর, কমলাপুর ও পূর্বাচলমুখী যাতায়াতের ক্ষেত্রে লাইন-১ নতুন পরিবহন সংযোগ তৈরি করবে। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নির্মাণকাজের অগ্রগতি, সময়মতো অবকাঠামো প্রস্তুত করা এবং অন্যান্য গণপরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের ওপর।
লাইন-৬-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় এলঅ্যান্ডটি
বাংলাদেশের মেট্রোরেল অবকাঠামো নির্মাণে এলঅ্যান্ডটির আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম চালু মেট্রোরেল করিডর ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬-এর সমন্বিত রেলব্যবস্থা স্থাপনের কাজ পেয়েছিল এবং সেই কাজ সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে লাইন-৬ বাণিজ্যিকভাবে চালু রয়েছে।
এলঅ্যান্ডটির পরিবহন অবকাঠামো বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান রামকুমার এস বলেন, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে নতুন করে চুক্তি পাওয়া বিশ্বজুড়ে বড় ও সমন্বিত নগর পরিবহন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার স্বীকৃতি।
তিনি জানান, ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬-এর বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ে এবং উচ্চমান বজায় রেখে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি জাকার্তা মেট্রোরেল প্রকল্পেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একীভূত করার অভিজ্ঞতা লাইন-১ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) খাতে কাজ করা এলঅ্যান্ডটি ভারতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রেল অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নতুন প্রকল্পেও নিরাপত্তা, গুণগত মান এবং নির্মাণকাজের নির্ধারিত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মেট্রোরেলসহ ১২ প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা
রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পসহ মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এসব প্রকল্পে আনুমানিক ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য সামগ্রিকভাবে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অঙ্ক ভিন্ন পরিসরের পরিকল্পনা ও প্রকল্পসমষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত; তাই এগুলোকে একই বিনিয়োগ হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
এদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পর টোকিওতে দেওয়া এক যৌথ বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে অংশীদার হওয়ার জন্যও তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
জাপানের অর্থায়নে লাইন-১ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং একই প্রকল্পে ভারতীয় ও জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ। তবে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণের গুণগত মান, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই হবে এর সফল বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ।
ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যাতায়াতব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল চালু হলে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নগর পরিবহনে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোকে কার্যকর অবকাঠামোয় রূপ দিতে নির্মাণকাজ, প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও অর্থায়নের ধারাবাহিকতা কতটা নিশ্চিত করা যায়।