গাজায় আবার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পাশাপাশি ভূখণ্ডটির প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে অন্যত্র চলে যেতে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় ঘনিয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে ডানপন্থি ‘পিপল অব ইসরায়েল’ দলের নেতা ওফের উইন্টারের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে কাটজ এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে গাজায় চলমান যুদ্ধ, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তর—এই তিনটি বিষয়কে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কাটজের দাবি, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইতোমধ্যে জনশূন্য হয়ে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে অবশিষ্ট জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এবং হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তবে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে না বলে মনে করছেন কাটজ। তাঁর বক্তব্য, হামাসকে নির্মূল করার নির্দেশ দেওয়া হলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী অভিযান শেষ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এরপর ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
চলতি মাসের শুরুতেও কাটজ বলেছিলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থল ও সমুদ্রপথে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষকে কোথায় স্থানান্তর করা হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
কাটজ এই উদ্যোগকে ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমনকি অধিকাংশ ফিলিস্তিনি গাজা ছেড়ে যেতে চান বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে এই দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ প্রকাশ্যে দেননি। এর আগে ২ সেপ্টেম্বরও কাটজ গাজার জনসংখ্যার বড় অংশের চলে যাওয়ার আগ্রহের কথা বলেছিলেন।
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ৫ সেপ্টেম্বর বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরিয়ে দেওয়ার কোনো মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনা নেই। কেউ স্বেচ্ছায় গাজা ছাড়তে চাইলে তার সুযোগ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েল সরকারের মধ্যেও এ বিষয়ে বক্তব্যের পার্থক্য দেখা গেছে। ৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা'আর বলেন, সরকার গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে বহিষ্কার বা বিতাড়নের পরিকল্পনা করছে না। তবে কোনো ফিলিস্তিনি স্বেচ্ছায় অন্য দেশে যেতে চাইলে এবং কোনো দেশ তাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকলে ইসরায়েল তাতে আপত্তি করবে না বলে জানান তিনি।
এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও ইসরায়েলি হামলার খবর এসেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন ধসে অন্তত ১২ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছিল।
দীর্ঘ সংঘাতের কারণে গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীই কোনো না কোনো সময় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক ভবন, অবকাঠামো ও জনজীবনের ওপর যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে নতুন করে সামরিক অভিযান কিংবা বড় পরিসরে জনসংখ্যা স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগ গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।