দেশের আট বিভাগে আটটি বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আগামী অর্থবছরের মধ্যেই দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং চিকিৎসার জন্য রাজধানী ও বড় শহরগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের আটটি বিভাগে আটটি বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলছে। এসব হাসপাতাল চালু হলে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে প্রতিটি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ জন্য ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত হাসপাতালগুলোতে সাধারণ চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিশেষায়িত কিছু সেবার জন্য নির্দিষ্ট শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের জন্য ২০টি, নবজাতকদের জন্য ২০টি এবং কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ১০টি ডায়ালাইসিস শয্যা স্থায়ীভাবে বরাদ্দ রাখা হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপজেলা পর্যায়ে মা ও নবজাতকের চিকিৎসা, প্রসবকালীন জরুরি সেবা এবং কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক রোগীকে নিজ এলাকার বাইরে যেতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা গেলে রোগীদের যাতায়াতের চাপ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত ভোগান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে পরিকল্পনার সুফল নিশ্চিত করতে হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্যানসার চিকিৎসার পাশাপাশি এ রোগ নিয়ে গবেষণার উন্নয়নেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ক্যানসার রোগের ধরন, প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা জোরদার করা গেলে রোগীদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশে ক্যানসার শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার সক্ষমতা উন্নত করার পাশাপাশি রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সম্ভব। তবে এ জন্য হাসপাতালগুলোর সঙ্গে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের তৈরি মানসম্মত ওষুধ আন্তর্জাতিক বাজারে সুনামের সঙ্গে রপ্তানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধের ব্যাপক উপস্থিতি তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশের ওষুধশিল্পের রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং উৎপাদনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রবেশ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাননিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে সেখানে বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ও মাননিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা প্রয়োজন।
বিগত সরকারের সময় দেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়েছিল এবং সেখানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা জরুরি বলে মনে করা হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করা, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা, ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর করা এবং বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা—এসব বিষয় চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সুস্থ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে না পারলে দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নকে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার সম্প্রসারণ নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বাস্তবিক অর্থেই একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়াতে, চিকিৎসাজনিত আর্থিক চাপ কমাতে এবং পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হলে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আট বিভাগে ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ এবং উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এবং সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।