
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে উত্তরার পশ্চিম থানাধীন ৭ নম্বর সেক্টরের বিএনএস সেন্টার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে আটক করা হয়। এ সময় তার সঙ্গে থাকা দলের অন্য সদস্যরা পালিয়ে গেলেও সানিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
উত্তরা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক কারবার ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। পুলিশের নথি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডে ‘দে লাড়া’ গ্রুপের নামও এসেছে একাধিকবার।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন সানি
পিচ্চি সানি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের উত্তরা পূর্ব থানা শাখার সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে অস্ত্রসহ তাকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব-১।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলায় সানির সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সে সময় স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সংগঠিত করে লাঠিসোঁটা হাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরাজুড়ে বিস্তৃত কিশোর গ্যাং নেটওয়ার্কের আড়ালে সরকারবিরোধী নাশকতার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খসরু চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) নূর মোহাম্মদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সর্বশেষ গ্রেফতারের পর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয়ভাবে আলোচিত ‘দে লাড়া’ গ্রুপের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে পিচ্চি সানির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে পুলিশের নথি ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরা এলাকার বিভিন্ন সেক্টরের পাশাপাশি উত্তরখান, দক্ষিণখান ও টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপটির তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টর থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত রেলপথসংলগ্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচায় গ্রুপটির সম্পৃক্ততার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনায় সানির দায় আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
আগেও গ্রেফতার হয়েছিলেন পিচ্চি সানি
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ আগস্ট চার সহযোগীসহ উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন সানি। ওই সময় তার কাছ থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা ও একটি হোন্ডা সিভিক গাড়ি উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিতে সানির বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণখান থানায় চারটি, উত্তরা পূর্ব থানায় একটি এবং উত্তরা পশ্চিম থানায় দুটি মামলা রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে এসব মামলা দায়ের করা হয়। তবে মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা, অভিযোগপত্র দাখিল কিংবা বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য
সর্বশেষ গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং নেতা পিচ্চি সানিকে বুধবার রাতে উত্তরার বিএনএস সেন্টার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও জানান, উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দমনে পুলিশ সব সময় সক্রিয় রয়েছে।
সানির বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে কী অগ্রগতি হয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেও নজর থাকবে স্থানীয় বাসিন্দাদের।