পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ক্রসফায়ার ও সাংবাদিকদের নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যের পর তাঁকে অপসারণের যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে আইজিপি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে অবস্থান থেকে সরে আসায় বিষয়টি নিয়ে আর বিতর্ক না বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তাঁর মতে, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে বক্তব্যটি নিয়ে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝির অবসান হওয়া উচিত।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ারও করবে। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, মাদকের টাকা না পেলে সাংবাদিকেরা পুলিশকে ‘অকার্যকর’ বলে সংবাদ প্রকাশ করেন। তাঁর এ বক্তব্যের পর মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইজিপিকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। অন্যদিকে, সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন তাঁর বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়।
বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর একটি বিবৃতি দিয়ে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়। এতে বলা হয়, আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। সাংবাদিকদের নিয়ে করা মন্তব্যটিও অসাবধানতাবশত এসেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর ইতিমধ্যে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে। আইজিপিও স্পষ্ট করেছেন, তাঁর বক্তব্যের যে অর্থ করা হয়েছে, সেটি তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। ফলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, “এটা আর আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত না। পুলিশ সদর দপ্তর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য দিয়ে তিনি ক্লিয়ার করেছেন, তিনি এটা মিন করেননি।”
তিনি আরও বলেন, আইজিপি নিজেই বুঝতে পেরেছেন যে তাঁর বক্তব্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে এবং পরে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত করা সমীচীন হবে না।
তবে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়টি এবং তাঁকে পদে রাখা বা সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত—দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাঁর ভাষ্য, সরকার ক্রসফায়ার চাইতে পারে না, পুলিশও আইনবহির্ভূতভাবে এমন পদক্ষেপ নিতে পারে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা বেআইনি কোনো কাজ করতে বাধ্য নন। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে আইন ও বিধিবিধানের মধ্যেই থাকতে হবে—এটাই সরকারের অবস্থান বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইজিপির বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে একদিকে পুলিশের জবাবদিহি, অন্যদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রশ্ন সামনে এসেছে। পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার বক্তব্যের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন ও বক্তব্যের তাৎপর্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি এ ধরনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে আইজিপির অপসারণের দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি। জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা ও আইজিপির বক্তব্য থেকে সরে আসার বিষয়টিকেই বিতর্কের অবসানের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছে সরকারপক্ষের এই উপদেষ্টা।