কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুমহল ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। তাঁর মতে, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সে কার সঙ্গে মিশছে—এসব বিষয়ে বাবা-মায়ের নজরদারি থাকা জরুরি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রাশেদ খান এসব কথা বলেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং তার বন্ধুদের সম্পর্কে বাবা-মায়ের খোঁজ রাখা দায়িত্বের অংশ। অপ্রতিমের ঘটনা পরিবারগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। ফুটেজে অপ্রতিমকে তুহিন নামের এক তরুণের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখা যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তুহিনসহ আরও দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
রাশেদ খান তাঁর পোস্টে দাবি করেন, অপ্রতিম তুলনামূলকভাবে সিনিয়র বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করত। সেই সূত্রে তুহিনদের সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়েছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। ছোটবেলায় বড়দের সঙ্গে ওঠাবসার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সবার ক্ষেত্রে বিষয়টি এক রকম নয়; তবে খারাপ সঙ্গ থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে পরিবারের নৈতিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় মুঠোফোনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি আইফোন পরে তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম গত শুক্রবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল এবং পরদিন শনিবার সানন্দা এলাকায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রাশেদ খান বলেন, বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি, ভিডিও ও জীবনযাপনের প্রদর্শন দেখিয়ে অল্পবয়সী ছেলেদের এসব চক্রের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। অপ্রতিমকেও ছবি তোলার কথা বা আইফোনের প্রলোভন দেখিয়ে বাইরে নেওয়া হয়েছিল বলে গণমাধ্যমে যে তথ্য এসেছে, তা উল্লেখ করে তিনি অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০ সেপ্টেম্বর সাধারণ শোক ঘোষণা করে ওই দিনের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করেছে। একই দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
রাশেদ খান তাঁর বক্তব্যে শুধু অভিভাবকদের দায়িত্বের কথাই বলেননি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, অপরাধী চক্রগুলোকে সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও পরিবার এমন ঘটনার শিকার হতে পারে।
পোস্টের শেষাংশে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মন্তব্যও করেন রাশেদ খান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একই সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমন এবং রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, জনসংখ্যার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা পর্যাপ্ত নয় এবং অতীতে বাহিনীগুলোকে দলীয়করণের যে অভিযোগ রয়েছে, সেটিও বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
এ সময় তিনি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এবং সরকারের ওপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানোর চাপের কথা তুলে ধরেন। এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে; এগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো চলমান। ফলে হত্যার প্রকৃত কারণ, কারা কীভাবে জড়িত এবং ঘটনার পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা ছিল—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তবে ঘটনাটি এরই মধ্যে অভিভাবকদের সন্তানদের নিরাপত্তা, বন্ধুত্ব এবং অনলাইন-অফলাইন যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।